দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশ পাওয়ার ৯৬ ঘণ্টার মধ্যে ইরানে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা বাহিনী। এ বিষয়ে জানেন এমন দুই মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে সিএনএন।
কর্মকর্তারা জানান, সম্ভাব্য হামলা চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় সামরিক শক্তি ইতোমধ্যে ওই অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়েছে। এ বছরের শুরুর দিকে ট্রাম্প পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান বন্ধ করার পর থেকে ইরানের রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণব্যবস্থা ও দ্রুত পুনর্গঠনযোগ্য অন্যান্য সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে নতুন অভিযান এর চেয়ে অনেক বড় পরিসরের হতে পারে।
এক মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ‘এটি হবে বড় ধরনের অভিযান।’ সামরিক পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তাও একই ধরনের ধারণা দিয়েছেন। তাঁদের কেউ কেউ মনে করছেন, ট্রাম্পের অনুমোদন দেওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। চলতি বছরের শেষ নাগাদ যেকোনো সময় এ নির্দেশ আসতে পারে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর এর সম্ভাবনা বেশি বলে তাঁদের ধারণা।
হামলার লক্ষ্যবস্তুতে জ্বালানি অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনা
মার্কিন কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, ইরানের সামরিক বাহিনী এখন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল সম্পর্কে আগের চেয়ে বেশি জানে। ফলে মার্কিন বাহিনীর পক্ষে পরিকল্পিত সব লক্ষ্যবস্তু কার্যকরভাবে ধ্বংস করা কঠিন হতে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ও পেন্টাগনের কর্মকর্তারা ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো, সামরিক স্থাপনা ও পারমাণবিক কেন্দ্রসহ বিস্তৃত লক্ষ্যবস্তুর তালিকা তৈরি করছেন। ট্রাম্প মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর কী পদক্ষেপ নেবেন, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। তবে বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপের দিকেই তিনি ঝুঁকছেন বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে তাঁরা সতর্ক করেছেন, অতীতেও ট্রাম্প কোনো কোনো পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়েও শেষ মুহূর্তে সরে এসেছেন।
হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। পেন্টাগনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ‘প্রতিরক্ষা দপ্তরের কাজ হলো পরিকল্পনা তৈরি করা এবং প্রেসিডেন্ট যে সামরিক পদক্ষেপের নির্দেশ দেবেন, তা বাস্তবায়ন করা।’
পাল্টা হামলার আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন উপস্থিতি কমানোর উদ্যোগ
সাম্প্রতিক মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র এবং সম্ভাব্যভাবে ইসরায়েলের নতুন হামলার আশঙ্কাকে ইরান ও হুতিরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। এ বিষয়ে অবগত আরও দুই সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে সিএনএন।
সূত্রগুলোর ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে নতুন করে সামরিক অভিযান চালালে তেহরান ও হুতিরা তাৎক্ষণিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সেনা ও স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালাতে পারে। এমনকি এ হামলা ওই অঞ্চলের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সিএনএনের আগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক জে ক্লেটনের ২৩ অক্টোবর পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে দেওয়া একটি অশ্রেণিবদ্ধ স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ইরান মার্কিন কর্মীদের লক্ষ্যবস্তু করার প্রচেষ্টা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ আরও কয়েকটি দেশে এ ধরনের হামলার পরিকল্পনা অগ্রসর পর্যায়ে রয়েছে বলেও গোয়েন্দা মূল্যায়নে উঠে এসেছে।
মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ধারণা, এই মুহূর্তে ইরান ও হুতিরা আগাম হামলা চালিয়ে উত্তেজনা বাড়ানোর পথে হাঁটবে না। তবে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল প্রথমে ইরানে হামলা চালালে তারা পাল্টা জবাব দিতে দ্বিধা করবে না।
এমন আঞ্চলিক নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে আগামী কয়েক দিনে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন দূতাবাস থেকে কর্মী সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম অব্যাহত থাকতে পারে। বর্তমানে সৌদি আরবের রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসেই কর্মীদের চলে যাওয়ার নির্দেশ কার্যকর রয়েছে। তবে অন্য দূতাবাসগুলোতেও একই ধরনের নির্দেশ দেওয়া হতে পারে। যেসব দূতাবাসে এমন নির্দেশ দেওয়া হবে না, সেখানেও কর্মীর সংখ্যা নির্ধারিত সীমার মধ্যে রাখা হতে পারে বলে জানিয়েছেন এক সূত্র।
এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে পরবর্তী দফায় মোতায়েনের জন্য নির্ধারিত অপ্রয়োজনীয় মার্কিন সামরিক কর্মীদের আর পাঠানো হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা। সম্ভাব্য আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির আশঙ্কার সঙ্গে এই সিদ্ধান্তের সম্পর্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন সামরিক তৎপরতা
রোববার হরমুজ প্রণালি পরিদর্শন করেছেন মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার। ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ বজায় রাখার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচলে সহায়তা করছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
সেন্টকম জানায়, হেলিকপ্টারে করে প্রণালির ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় কুপার সেখানকার চলমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। এ সময় ইরানের পুঁতে রাখা মাইন অপসারণে কাজ করা সামরিক সদস্যদের সঙ্গেও তিনি কথা বলেন।
এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে কুপার বলেন, ‘উপসাগরীয় অংশীদার ও নৌপরিবহন খাতের সঙ্গে আমরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। হরমুজ প্রণালিতে অব্যাহতভাবে অবাধ নৌচলাচল নিশ্চিত করার বিষয়ে আমাদের দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন এই সফর।’
প্রণালি দিয়ে ট্যাংকার চলাচল বাড়লেও সম্ভাব্য ইরানি হামলার আশঙ্কাসহ বিভিন্ন কারণে তেলের দাম উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয় বলে স্বীকার করেছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা। তাঁর মতে, শেষ মুহূর্তে কূটনৈতিক সমাধান না এলে এ পরিস্থিতি ট্রাম্পকে সামরিক পদক্ষেপের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তবে সংঘাতের অবসানে হোয়াইট হাউসের বৃহত্তর কৌশল কী, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
ইরানে নতুন হামলার জন্য চাপ দিচ্ছে ইসরায়েল
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর চেষ্টা করছেন। তবে ট্রাম্প প্রশাসন যৌথ সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে অপেক্ষা করতে বলেছে বলে জানিয়েছেন দুই মার্কিন কর্মকর্তা ও ইসরায়েলের এক নিরাপত্তা সূত্র।
ইসরায়েলি ওই সূত্র সিএনএনকে বলেন, ‘নেতানিয়াহু নির্বাচনের আগে ইরানে যৌথ হামলার জন্য ট্রাম্পকে রাজি করানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প সবুজ সংকেত দেননি।’
তবে নেতানিয়াহুর কার্যালয় এ খবরকে ‘ভুয়া খবর’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। ইসরায়েলের নিরাপত্তা সূত্রটির দাবি, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) প্রধান এয়াল জামির যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনকে জানিয়েছিলেন, এ সময় হামলা চালালে ইসরায়েলের নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এবং নির্বাচন পিছিয়ে যেতে পারে। এটিও ট্রাম্পের অনুমোদন না দেওয়ার একটি কারণ বলে ওই সূত্র দাবি করেছে।
ইসরায়েলের চ্যানেল ১২ নিউজ রোববার জানিয়েছে, মঙ্গলবারের ভোটের ৪৮ ঘণ্টারও কম সময় আগে জামির ও নেতানিয়াহুর মধ্যে নজিরবিহীন বিরোধ দেখা দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান-সম্পর্কিত একটি নির্দেশ পাওয়ার পর জামির তা বাস্তবায়নের আগে বিস্তারিত আলোচনা ও আইনি অনুমোদন চান। তাঁর আশঙ্কা ছিল, ভুল হিসাব থেকে তাৎক্ষণিক সংঘাত শুরু হতে পারে।
তবে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ ওই প্রতিবেদনকে ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা’ বলে অভিহিত করেছেন।
সিএনএনকে বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত তৃতীয় এক সূত্র জানায়, গত এক সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় ধরে ইরানে নতুন হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল ইসরায়েল। এ জন্য মার্কিন কর্মকর্তাদের সমর্থনও চাইছিল দেশটি। তবে ট্রাম্পসহ জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তারা ইসরায়েলকে আপাতত অপেক্ষা করতে বলেছেন। একই সঙ্গে দুই দেশ শিগগিরই যৌথ অভিযান চালাতে পারে—এমন ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে।
সূত্রগুলোর মতে, ইসরায়েল আপাতত নতুন হামলার পরিকল্পনা স্থগিত রাখলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য যৌথ অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ ধরনের অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
একটি সূত্র জানায়, নতুন হামলা পিছিয়ে দিতে ইসরায়েলের সম্মত হওয়ার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সহায়তার প্রয়োজনও ভূমিকা রেখেছে। ইরান ও হুতিরা পাল্টা হামলা চালাতে পারে, আর যুদ্ধের কারণে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও চাপে রয়েছে।
সাম্প্রতিক মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নের সঙ্গে পরিচিত এক সূত্রের মতে, ইরানের শাসনব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করা এবং দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখানোর বাইরে নেতানিয়াহু ও তাঁর মিত্রদের সুস্পষ্ট কৌশলগত লক্ষ্য এখনো নেই।
চলতি সপ্তাহে আইডিএফের এক স্নাতক সমাপনী অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে নেতানিয়াহু বলেন, ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানোই আইডিএফ, মোসাদ ও অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার প্রতি তাঁর নির্দেশনা।
সিএনএনকে ওই একই সূত্র বলেন, ‘পরিকল্পনাগুলো প্রস্তুত রয়েছে। ট্রাম্পের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরও হতে পারে।’
সূত্র: সিএনএন
এমএস/